আজ সেই ভয়াল কালরাত

14

‘অবিনাশী আগুনে পোড়ে হায়রে শোকার্ত স্বদেশ/দুখিনী মায়ের অশ্রু জমা হয় নিভৃত পাঁজরে/যে যাবে যুদ্ধে এখনি সে উঠুক উঠুক ঝলসে/ যে যাবে যুদ্ধে সবকিছু ভাঙুক সে….।’

উত্তাল দিন শেষে নেমেছে সন্ধ্যা। গভীর হতে শুরু করেছে রাত। একাত্তর সালের ২৫ মার্চ কৃষ্ণপক্ষের রাত। তখনও কেউ জানে না কী ভয়ঙ্কর, নৃশংস ও বিভীষিকাময় রাত আসছে বাঙালীর জীবনে। ব্যস্ত শহর ঢাকা প্রস্তুতি নিচ্ছে ঘুমের। ঘরে ঘরে অনেকে তখন ঘুমিয়েও পড়েছে। হঠাৎই যেন খুলে গেল নরকের সবক’টি দরজা।

রাত সাড়ে ১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রথম রাস্তায় নেমে আসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তারা প্রথমে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স এবং পরে একে একে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি ও পিলখানা পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদর দপ্তরসহ ঢাকার সর্বত্র আক্রমণ চালিয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাশাপাশি নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরেও।

তবে রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তরে পাকিস্তানি সেনাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা প্রথমে আত্মসমর্পণে রাজি হননি।

রাইফেল তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তারা। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারী মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে যায় সব ব্যারিকেড। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশ সদর দপ্তর। সেখান থেকে ঘাতক বাহিনী এগোতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে।

পরে রাতভর ঢাকায় অতর্কিতে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা।

তারা ট্যাঙ্ক ও সৈন্যবোঝাই লরি নিয়ে ঢুকে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। একে একে সব হলেই হত্যাযজ্ঞ চালায়। পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে রক্ষা পাননি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। এক রাতে তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রী ও ৩৯ শিক্ষক শহীদ হন।

দানবীয় বাহিনীর আক্রমণে মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা নগরীই পরিণত হয় লাশের শহরে।

অবশ্য এ পরিস্থিতিতেও রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বাঙালি ছাত্র-জনতা। ঢাকার ফার্মগেট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশেই এ প্রতিরোধ ছিল; প্রতিরোধ ছিল চট্টগ্রামেও।

এর আগের দিন ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট হাউসে চলমান মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের অংশ হিসেবে আয়োজিত আওয়ামী লীগ ও পাকিস্তান সরকারের উপদেষ্টা পর্যায়ের মধ্যকার বৈঠকও কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

২৫ মার্চ শুরু হওয়া এই বাঙালি নিধনযজ্ঞ চলে পরের টানা নয় মাস। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে গোটা বাংলাদেশই হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। নৃশংস ও বর্বরোচিত এ হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তাদের এদেশীয় দোসর ঘাতক দালাল রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা।

জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে ২৫ মার্চের কালরাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার সব মানুষকে। রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ‘কালরাত্রি’ স্মরণে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। দিনভর থাকছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও রাতে মোমবাতি প্রজ্বালন।

সেই কালরাত স্মরণে এবার ২৫ মার্চ রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট পর্যন্ত সারা দেশে প্রতীকী ‘ব্ল্যাকআউট’ কর্মসূচি পালন করবে সরকার। তবে কেপিআই এবং জরুরি স্থাপনা এ কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকবে।

২৫ মার্চ রাতে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি ভবন ও স্থাপনাসমূহে কোনো আলোকসজ্জা করা যাবে না। তবে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে সন্ধ্যা থেকে আলোকসজ্জা করা যাবে।

নিউজ হান্ট/ম