ঈদেও আসে না তাদের হাসি

28

‘ছোট বেলা থেকে আমার ছেলেটা ঈদের আগের দিন কত বায়না করত। ও রে পটকা কেনার টাকা দিতে হইবো। শার্ট, গেঞ্জি পছন্দ না হলে বার বার পাল্টাইতে হইবো। ওর বাপ একটু বেশি রাগী ছিল। তাই ভয়ে সব কিছু আমারেই কইতো। ওর (ছেলের) বাপ রে লুকাইয়া, ওরে যে (ছেলেকে) কত টেকা দিছি। এখন তো ওরই অনেক টেকা।’

কথাগুলো বলতে বলতেই হু হু করে কেঁদে ফেললেন মর্জিনা বেগম। ঈদের সময়ের স্মৃতিগুলো মনে করে ৭০ বছর বয়সী এই নারী বার বার তার মুখে কাপড় দিয়ে চোখ মোছার চেষ্টা করছিলেন।

বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে হয়তো বা এখন অনেক কিছু মনে পড়ে না তার। অথবা কিছু মনে করতেও চান না তিনি।

তাই তো কোনো ভাবেই তার সেই ছেলের নাম বা পরিচয় কিছুই বলতে রাজি হননি এই মা। কারণ এই মায়ের খবর নেয় না সেই ছেলে বা পরিবারের অন্য কোনো আপনজন।

মর্জিনা বেগমের ঠিক ৪/৫ গজ দূরে বসে মুখে হাত দিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলেন আরেক মা। তারও বয়স ষাটোর্ধ। তিনিও জেনে গেছেন কাল ঈদ। তাই নিজের ফেলে আসা সুখ-দুঃখের স্মৃতি গুলো মনে পড়ছে তার।

তবে মুখে তেমন কিছু বলতে পারেন না এ অভাগী মা। শুধু ঈশারায় কিছু বোঝান তিনি। কয়েক মাস আগে সড়কে পড়েছিলেন এই মা। পরে তাকে পুলিশের সহায়তায় আনা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।

আরেকজন মা জহুরা খাতুন। বয়স আনুমানিক ৯০ বছর। পরিবার, সন্তান জমিজমা থাকলেও শেষ বয়সে ঘর সংসার ছাড়া হতে হয়েছে তাকে। স্বামীর মৃত্যুর পরে সন্তানেরাও জায়গা দেয়নি বৃদ্ধ মাকে।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে তাই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অসুস্থ হয়ে গেছেন তিনি। অসুস্থ সেই মা-কেও রাস্তা থেকে তুলে এনে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় দিয়েছেন। সারা বছর তো নয়ই এমনকি ঈদের সময়ও তার খোঁজ নিতে আসেনি কোনো সন্তান বা আপনজন।

শুধু মাত্র এই মায়েরাই নয়, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ৭৫ জন মা জানেন রাত পোহালেই ঈদ। কিন্তু অন্যদের মতো ঈদের আনন্দ নেই কারও মনেই। নেই কোনো আপনজনের অপেক্ষা। কারণ তারা জানেন কোনো আপনজনই তাদের আর খোঁজ নেবে না।

এক সময় স্বামী, সন্তান, বাবা- মা এবং পরিবার সবই ছিল তাদের। কিন্তু ভাগ্যের কষাঘাতে তারা এখন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। কোনো আপনজন থেকেও নেই তাদের।

আপনজনহীন এসব মায়েদের আপন করে নিয়েছে ” আপন নিবাস’ নামের একটি বৃদ্ধাশ্রম। রাস্তায় পড়ে থাকা অসুস্থ মায়েদের তুলে এনেছেন তারা। করছেন সেবা যত্ব, ব্যবস্থা করেছেন চিকিৎসার এবং থাকা খাওয়ার।

শুধু তাই নয়, মৃত্যুর পরে এই মায়েদের দাফন কাফন সবই করে “আপন নিবাস’ বৃদ্ধাশ্রম। রাজধানীর উত্তরার উত্তরখান মৈনারটেকে ছোট একটা বাড়িতে গড়ে উঠেছে এই বৃদ্ধাশ্রমটি।

নিউজ হান্ট/ম

পূর্ববর্তী নিবন্ধইসরাইল হটাতে এরদোগানের ঐক্যের ডাক
পরবর্তী নিবন্ধঅমিত শাহকে ‘খুঁজে’ না পেয়ে থানায় জিডি