ঢাকা টু কাবুল: চীনকে আটকাতে মোদির মিশন

55

রেজাউল করিম: আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান; তারপর বাংলাদেশ- ভারত একে একে সব দেশে পররাষ্ট্রনীতি শক্তিশালী করে চীনকে হটাতে চাইছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে যাত্রা করার আগে আগে তালেবান ও আফগান সরকারের মধ্যে আলোচনায় অংশ নিয়ে সবেমাত্র মস্কো থেকে ফিরে আসা আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হানিফ আতমারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

মোদি আশা করছেন, এই সফর এবং প্রতিবেশিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি বেইজিংকে যথাযথভাবে এই বার্তা পাঠাবেন যে, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া একে অপরের অন্তর্ভুক্ত এবং সেখানে তৃতীয়পক্ষের কোনো স্থান নেই।

এদিকে পাকিস্তান থেকে সিন্ধু পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনার জন্য একটি দল ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছে। তার আগে একটি পাকিস্তানি অশ্বারোহী দল দিল্লির উপকণ্ঠে আন্তর্জাতিক তাঁবু-পেগিং ফেডারেশনে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নিয়েছে, যার জন্য তারা তাদের প্রতিপক্ষ ও আয়োজক ভারতীয়দের কাছ থেকে ঘোড়া ধারও করেছিল।

ভারত জানে প্রতিবেশিদের অবশ্যই বোঝাতে হবে
বাংলাদেশ সফরের আগে এই সপ্তাহে মোদি উপমহাদেশের দিকে দৃষ্টি বিস্তৃত করছেন। তার ইচ্ছা, যাতে তিনি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হারিয়ে যাওয়া ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রভাব পুনরুদ্ধার করতে পারেন। কারণ পাকিস্তানের সাথে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নয়াদিল্লি যেকোনও বিষয়ে কথা বলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

ভারতের জন্য চীন অবশ্যই একটি স্বীকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী। দেশটি পাকিস্তানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুপরিচিত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং পাকিস্তানের পাশাপাশি আফগানিস্তানে কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় চীন তা নিয়ে মস্কোতে গত সপ্তাহে আলোচনা করেছে।

এদিকে বাংলাদেশে, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভিডিও বার্তাটি (বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষ্যে) গত সপ্তাহে ঢাকার প্যারেড গ্রাউন্ডে বর্ষপূর্তির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রথম বাজানো হয়।

দিল্লিতে আতমারের উপস্থিতি দেখে অবশ্যই বোঝা যায় যে গ্রেট গেমের নতুন অধ্যায় চলছে। গ্রেট গেমের এই বাক্যটি ব্যবহৃত হয়েছিল ১৮৩০ সালে যখন গভর্নর-জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্ককে লন্ডন থেকে বুখারার (আফগানিস্তান) জন্য একটি বাণিজ্যিক রুট সন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। যাতে আফগানিস্তানের মতো দেশগুলো ব্রিটিশ এবং রাশিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যে বাফার অঞ্চল হয়ে যায়।

ভারত এখন আফগান শান্তি আলোচনার টেবিলে
আজকাল কাবুলে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক তোড়জোড় তীব্র হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন সম্প্রতি আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির কাছে একটি চিঠি লিখে আফগান প্রবীণ নেতাদের মধ্যে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। যাদের মধ্যে আছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, স্বয়ং ঘানি এবং দেশটির প্রধান নির্বাহী ডাঃ আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ, মোহাম্মদ আতা নূর এবং আবু সায়াফের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং অবশ্যই তালেবান।

এপ্রিল মাসে তুরস্কে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানের জন্য তুর্কি এক আকর্ষণীয় পছন্দ, কারণ দেশটিকে পাকিস্তানের নিকটবর্তী বলে দেখা গেছে। যদিও ক্রমবর্ধমান অজনপ্রিয় ঘানি ব্লিংকেনের আরেকটি শান্তি উদ্যোগের প্রয়াসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে তিনি বরং বলেছেন, যেদিকে বাতাস বয়, আমি সেদিকে যাওয়ার লোক নই। যদিও তিনি দেখতে পাচ্ছেন যে তুরস্কে যাওয়া ছাড়া তার কাছে বিকল্প কিছুই নেই।

আপনি কী জিজ্ঞাসা করবেন, এর সাথে দিল্লির সফরের কি সম্পর্ক? উত্তর হল আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে মস্কোর ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা যায়। এই অনুভূত সান্নিধ্য ১৯৮০ এর দশক থেকে শুরু হয়েছে, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণের পরে। তখন তরুণ আতমার আফগান গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে কাজ করেছিলেন, যেটাতে অবশ্যই সোভিয়েতদের সম্পূর্ণ অর্থায়ন এবং সমর্থিত ছিল।

আতমার তখন মুজাহিদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং ১৯৮৭ সালে জালালাবাদে একটি যুদ্ধে নিজের একটি পা-ও হারান। তবে তিনি বেঁচে যান। ১১/১১-এর পরে আমেরিকানরা যখন তালেবানদের তাড়িয়ে দেয়, আতমার প্রথমে কারজাইয়ের পক্ষে কাজ করেন, পরে ঘানির পক্ষে। আফগান গ্রেট গেমের একজন জীবিত মানুষ হিসেবে অন্তর্নিহিত এশিয়ার প্রভাবের জন্য বড় বড় শক্তিগুলো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে তার ব্রিফিং উল্লেখযোগ্য হবে।

এদিকে কয়েক সপ্তাহ আগে আফগানিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জালমে খলিলজাদ ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে বলেছেন, পাকিস্তান ও ইরানের মতো আফগানিস্তানের প্রতিবেশি ভারতও তুরস্কে হতে যাওয়া নতুন শান্তি আলোচনার অংশ হবে।

এজন্য আতমার দিল্লিতে গেছেন। কারণ পাকিস্তান বিরোধিতা সত্ত্বেও ভারত আফগান টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে। তুরস্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আগে এই বিষয়ে বেশ কয়েকটি ব্রিফিং ভারতের জন্য দুর্দান্ত প্রস্তুতি।

একের মধ্যে ভারতের নির্বাচন ও বৈদেশিক নীতি
আতমার দেশে ফিরলে, মোদি স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীতে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। দক্ষিণ এশিয়ার আরও চার নেতা-মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম সোলিহ, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারী, শ্রীলঙ্কা মহিন্দা রাজাপাকসে এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং এই বার্ষিকীতে অংশ নিচ্ছেন।

মোদি সাতক্ষীরা জেলায় যাবেন যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরে শ্রদ্ধা জানাতে-যেটা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত। এটা পশ্চিমগঙ্গার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার কাছাকাছি। পশ্চিমবঙ্গের এই জেলাতেই কয়েক সপ্তাহ পর নির্বাচন হবে।

মোদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এবং বৃহত্তর মতুয়া সম্প্রদায়ের সাথে আলাপচারিতার জন্য গোপালগঞ্জেও যাবেন। ভারতের থাকা তফসিলি এই বর্ণগোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ৪০-৪৪টি আসনে প্রভাব ফেলবে বলে জানা যাচ্ছে।

স্পষ্টতই ভারতীয় জনতা পার্টি আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর হবে হবে দেনা পরিশোধের। একটা ব্যাপার নোট করুন যে, বিজেপি নেতারা এখন সচেতনভাবেই বাংলাদেশিদের সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করা থেকে দূরে রয়েছেন।

যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একবার বাংলাদেশিদের “উইপোকা” বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় তার মুখ থেকে এখন তেমন কিছু বের হচ্ছে না। অবশ্যই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে তার দেশের পুরনো প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তিনি কাবুলের সাথে আরও যুক্ত হতে চান এবং তিনি ঢাকার সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্ক রাখতে চান। এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে চরম তিক্ততা চান না। এই অঞ্চল জুড়ে চীন যে বিশাল আকার ধারণ করছে, সেটা মাথায় রেখে মোদিও জানেন যে, চীনের সাথে সাথে ভারতকেও এই খেলায় অবশ্যই অবশ্যই নামতে হবে!

তথ্যসূত্র: দ্য প্রিন্ট, দ্য ওয়্যার, দ্য হিন্দু, হিন্দুস্তান টাইমস