পশ্চিমাদের ঘাঁটি পাহারা দিয়ে আফগানদের হত্যা করছে তালেবান!

19

তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানের পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিগুলোকে প্রতিপক্ষ ও দুর্বৃত্ত ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ থেকে রক্ষা করছে এবং এটা তারা করে আসছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। আজ শনিবার (১মে) আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এই ডেডলাইন ধরেই পশ্চিমাদের ঘাঁটি রক্ষার কাজ করে যাচ্ছে তালেবানরা। পশ্চিমা ঘাঁটিগুলো রক্ষার জন্য তালেবান ‘তালেবান সুরক্ষা বলয়ও’ তৈরি করেছে। এসময় তারা বিদেশি বাহিনী বাদ দিয়ে আফগান সরকারি বাহিনীকে টার্গেট করছে এবং তাদের হত্যা করছে। সেনা প্রত্যাহার চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত তিনজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একথা জানিয়েছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এ জাতীয় কোনও দলিলের অস্তিত্ব নিয়ে রয়টার্সকে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্বীকার করেছে। এছাড়া ওই তিন কর্মকর্তাও ‘তালেবান সুরক্ষা বলয়’ (তালেবান রিং অফ প্রোটেকশন) নিয়ে তাত্ক্ষণিক কোনও মন্তব্য করেনি।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালেবানের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করার পর থেকে আমেরিকা তার দীর্ঘতম যুদ্ধের অবসানের পথ সুগম করেছে, এই সময়ে সেখানে কোনও মার্কিনির মৃত্যু হয়নি এবং মার্কিন ঘাঁটিতে কেবল বিচ্ছিন্নভাবে অল্প কিছু আক্রমণ চালানো হয়েছে। পরিবর্তে, তালেবানরা আফগান সরকারী বাহিনীর উপর হামলা আরও তীব্র করেছে এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা বেড়েছে।

সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া তালেবান ও সরকারের মধ্যে শান্তি আলোচনার তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি এবং জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছরের আগে থেকে ২০২০ সালের শেষ তিন মাসে বেসামরিক লোকজনের হতাহতের পরিমাণ ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।

তালেবানদের ধৈর্য পরীক্ষা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি আগের মার্কিন প্রশাসনের দ্বারা সম্মত ১ মে তারিখের সময়সীমাকে ছাড়িয়ে যাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার ৯/১১ হামলার ২০তম বার্ষিকীর মধ্যেই সেনা ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

কাবুলের পশ্চিমাঞ্চলীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, আজ শনিবার যখন সময়সীমাটি শেষ হবে তখন প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে থাকবে। আফগানিস্তানে বিদেশি বাহিনীর কমান্ডার, মার্কিন সেনা জেনারেল স্কট মিলার এই সপ্তাহের শুরুতে বলেছিলেন, সুশৃঙ্খলভাবে প্রত্যাহার এবং সামরিক ঘাঁটি এবং সরঞ্জাম আফগান বাহিনীর হাতে হস্তান্তর শুরু হয়েছে।

আফগান সৈন্যরা এই ঘাঁটিগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ছেড়ে দিয়েছিল। তবে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে কৌশলগত অবস্থান দখল করে থাকা তালেবান যোদ্ধাদের যেকোনও আক্রমণকে প্রতিহত করতে প্রচুর ফায়ারপাওয়ারের প্রয়োজন হতে পারে।

মার্কিন বাহিনীকে আরও কয়েকমাস সময় নিতে হবে বলে বাইডেনের ঘোষণার পরে আক্রমণাত্মক আক্রমণ চালিয়ে ১০০ এরও বেশি আফগান নিরাপত্তা কর্মীকে হত্যা করেছে তালেবান।

পশ্চিমা দু’জন কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটন ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীর আক্রমণ থেকে পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিগুলোকে রক্ষা করার তালেবানদের প্রস্তাবকে মেনে নিয়েছে।

কর্মকর্তারা বলেছেন, আফগান মাটি ব্যবহার করে মার্কিন স্বার্থে হামলা করা হবে না- এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করে তালেবানরা আস্থা প্রদর্শন করতে চেয়েছিল- ফেব্রুয়ারির চুক্তিতে যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি।

এই প্রক্রিয়াতে যুক্ত এক পশ্চিমা কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, ‘তারা প্রায় একটি বাফারের জোনের মতো কভার স্তর সরবরাহ করেছিল এবং তাদের যোদ্ধাদের এই সময়ের মধ্যে কোনও বিদেশি সৈন্যকে আহত বা হত্যা না করার নির্দেশ দেয়।’

পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, তালেবানদের পক্ষে তার আন্দোলনে আরও জালিয়াতিবাদী দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা প্রদর্শন করাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো, যারা প্রায়শই নিজস্ব এজেন্ডা অনুসরণ করে, যদিও এর নেতা সিরাজউদ্দিন হাক্কানী তালেবানদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ র‌্যাঙ্কিং কমান্ডার।

কাবুলভিত্তিক পশ্চিমা নিরাপত্তা এক কর্মকর্তা বলেছেন, তালেবানরা দর কষাকষির পক্ষে ছিল। তিনি বলেন, ‘তালেবানরা হাক্কানি নেটওয়ার্ক এবং ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের ঘাঁটিগুলোর আশেপাশে চালানো এমনকি ছোটখাটো হামলার জবাব দেয়।

তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ তথাকথিত ‘সুরক্ষা বলয়’ চুক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন।

আরও বিস্তৃতভাবে তিনি বলেছেন যে, শনিবারের সময়সীমা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রকে কোনও সুরক্ষা গ্যারান্টি দেওয়া হয়নি, তবে গ্রুপের নেতৃত্বের সাথে এবং মার্কিন পক্ষের সাথে আলোচনা চলছে।

মুজাহিদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বিদেশি সেনাদের আক্রমণ না করার আমাদের প্রতিশ্রুতি ১ মে পর্যন্ত, এরপরে আমরা আক্রমণ করব কিনা তা আলোচনার বিষয়।

তালেবানের আকে মুখপাত্র সুহেল শাহীন এক টুইটার পোস্টে বলেছেন, বৃহস্পতিবার শান্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূত জালমে খলিলজাদের সাথে তালিবানের উপ-রাজনৈতিক প্রধান মোল্লা বারাদার আলোচনা করেছেন।

স্পষ্টতই পশ্চিমা ঘাঁটির আশেপাশে কোনো জঙ্গিদের অবস্থান থাকাটা বিপদ হিসাবে দেখা হয়, যদিও এ বিষয়ে কোনও সমঝোতা না হয়।

“তারা অবশ্যই অনেক আফগানিস্তান এবং বিদেশী ঘাঁটির খুব কাছাকাছি চলে গেছে,” ।

লন্ডন ভিত্তিক থিংক-ট্যাঙ্ক ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের সশস্ত্র গ্রুপের গবেষণা কেন্দ্রের সহ-পরিচালক অ্যাশলে জ্যাকসন বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো এবং আফগান ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে রাখা বিদেশি সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পরে নিজেদের দখল করার জন্য তালেবনেরন কৌশল বলে মনে হচ্ছে।’

আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে মুখপাত্র ফাওয়াদ আমান বলেছেন, বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সময় তালেবানরা আফগান জনগণ ও তাদের সরকারের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়েছে।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে ৩,০০০ এরও বেশি আফগান বেসামরিক মানুষ মারা গিয়েছিল এবং প্রায় ৫,৮০০ আহত হয়েছিল।

আমান বলেছেন, ‘বিদেশী বাহিনীর উপর আক্রমণ না করে ক্রমাগত আফগান নিরাপত্তা বাহিনী এবং বেসামরিক লোকদের লক্ষ্য করে তালেবান দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা আফগানিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।’

নিউজ হান্ট/আরকে

পূর্ববর্তী নিবন্ধহেফাজত নেতা জুনায়েদ কাসেমী ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধভারতের বাইরেও টিকা উৎপাদন করতে চায় সেরাম