মমতার তৃণমূলের জয়ের ৫ কারণ

29

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে পরিমাণ সভা করেছেন, এর আগে কোনও প্রধানমন্ত্রী সেটা করেননি। তবে সভা করার দৌড়ে পায়ে আঘাত নিয়েও পিছিয়ে ছিলেন না তৃণমূল প্রধান মমতা ব্যানার্জীও। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিজেপির হয়ে রাজ্যে নির্বাচনী সভা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, যোগী আদিত্য নাথ, জে পি নাড্ডা সহ বিজেপির হেভিওয়েট নেতারা। তবে পায়ে আঘাত নিয়েও মোদি-শাহের বিরুদ্ধে রাজ্য জুড়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন মমতা।

এই প্রথমবার এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগাম ফল নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা ছিল। গতকাল (শনিবার) পর্যন্ত যাকেই ভোটের ফল নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সেই বলেছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। লড়াইটা এবার হাড্ডাহাড্ডি হবে বলে মনে হচ্ছে। আসলে প্রথম দুই দফা ভোটের পর থেকে নির্বাচন কমিশন এতটাই কড়াকড়ি করে যে, হাওয়ায় রটে যায়, মানুষের ভোট মানুষ দিয়েছে। আর মানুষের ভোটের বেশিরভাগটাই যাবে বিরোধী জোটের পক্ষে।

কিন্তু আজ নির্বাচনের ফল ঘোষণা হতেই দেখা গেল অন্য ছবি। রীতিমতো ঝড়ের মতো বিরোধীদের উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০০-রও বেশি আসন এখন তাদের দখলে। কিন্তু এটা হলটা কীভাবে? এই বিরাট জয়ের তো কোনও না কোনো কারণও আছে? সেটা কী ?

১. ব্র্যান্ড মমতা: হ্যাঁ, কিছু মানুষ থাকেনই এমন। যারা একাই একশো। এই নির্বাচনে প্রচারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে একের পর এক সমালোচনার জবাব দিতে হয়েছে বিরোধীদের। তার দলের লোকদের নিয়ে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ। মুখ্যমন্ত্রী তারপরে বলেছেন, সব ক্ষমা-ঘেন্না করে দিয়ে, অভিমান, রাগ ঝেড়ে ফেলে, মানুষ যেন তাকেই ভোট দেন।

এই নির্বাচনে বিরোধী বিজেপিকে মমতা একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন, এই রাজ্যে তাদের মুখ্যমন্ত্রী পদের প্রার্থী কে? তৃণমূলে মমতার বিপরীতে বিজেপির দিকটা ছিল অস্পষ্ট। তার চেয়ে বড় কথা মমতা এখন কেবল বাংলার নেত্রী নন, তিনি এখন সর্বভারতীয় নেত্রী। কেন্দ্রেও বিজেপিকে সরকারকে টেক্কা দিতে মমতার মতো নেতা এখন পুরো ভারতেই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এই বিরাট জয়ের প্রধান কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামটাই।

২.বিজেপিকে বহিরাগত বা বাইরের দল প্রমাণে সমর্থ তৃণমূল: নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই বিজেপিকে গুজরাটের দল হিসেবে তুলে ধরে তৃণমূল এবং কথাটা মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়। সিপিএমকে হারাতে যদিও তারা এক সময় এই বিজেপির সঙ্গে জোট গড়েছিলেন। তবে এবার প্রচারে তারা বলে, বিজেপি ক্ষমতায় গেলে বাংলা পরাধীন হয়ে যাবে। বাংলার বহুত্ববাদ, সাম্পদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবে এবং বাংলার সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যাবে। তবে তৃণমূলের এই অভিযোগ খন্ডানোর মতো মুখ বাংলায় বিজেপির কেউ ছিল না। ফলে সব প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে মোদি ও অমিত শাহকে। ফলে তৃণমূল বাংলার মানুষকে আরও বেশি করে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, বিজেপি ক্ষমতায় গেলে বাংলার কারো হাতেই কোনো ক্ষমতা থাকবে না, সব চলে যাবে বাইরের লোকদের হাতে। মানুষ তৃণমূলের এই কথা ব্যাপকহারে বিশ্বাস করেছে।

৩. উন্নয়ন: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার দলের লোকেরা সমানে যে কাজের ফিরিস্তি দেন, সেটা ঠিক না ভুল সেই হিসেব আজকেই করতে বসার মানে হয় না। তবে, ওই রাজ্যের মানুষ দেখেছে সেখানকার রাস্তার রূপ বদলে গেছে অনেকটাই। এখন এ রাজ্যের মানুষকে খানাখন্দে ভরা রাস্তায় আর চলতে হয় না। মানুষ মসৃণ গতিতে ছুটতে পারেন নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। শহর থেকে মফঃস্বল কিংবা গ্রামের রাস্তারও চেহারা একই। সঙ্গে আলো। আগের থেকে বেড়েছে বইকি। নিজের পাড়ার রাস্তাটা একটু ভালো হলে, অথবা একটু বেশি আলো পেলে, মানুষ আর ভোট দেবেন না কেন! এছাড়া টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও সরকারি অনেক পরিষেবা মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কাজটা বেশ ভালোই করেছে তৃণমূল।

৪. দলত্যাগীদের বিজেপির দলে টানা ও বাম-কংগ্রেস ভোট: বিধানসভা ভোটের প্রচারপর্বে রাজ্যে এসে একাধিক বার ২০০ আসনে জেতার দাবি করে গেছেন বিজেপির সাবেক সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ । কিন্তু ১০০ আসনেও পশ্চিমবঙ্গে জিততে পারেনি বিজেপি। যদিও ৩ বছর আগে লোকসভা ভোটে অনেকটাই হিসেব মিলিয়েছিলেন অমিত শাহ। ২০১৯-এর রাজ্যের ৪২টি লোকসভা আসনের অর্ধেক আসনে জেতার দাবি করেছিলেন তিনি। বিজেপি জিতেছিল ১৮টিতে।

আসলে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে তৃণমূল ছেড়ে আসা সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রীদের দলে জায়গা দিয়ে সঠিক কাজ করেনি বলে বিজেপির একটি অংশ বলছেন। বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার যেমন ভোটের ফলের পর বলেছেন, ‘নব্য বিজেপি, যারা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে আসা এবং তাদের গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী করা এই পরাজয়ের কারণ হতে পারে।’

বিজেপির আরেক এক নেতা সায়ন্তন বসু বলেছেন, ‘মানুষ যখন আমাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন তখন বুঝতে হবে মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর ভরসা রেখেছেন। তাছাড়া বিজেপির প্রার্থী নির্বাচন সঠিক নাও হতে পারে।’

এছাড়া নির্বাচনে বড় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়েছে বাম-কংগ্রেস ভোট। রাজ্যের দক্ষিণাংশে অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে দুটি দল। বিক্ষিপ্ত কিছু আসন ছাড়া তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। দুদলের ভোটাররাই হয়তো মনে করেছেন, তাদের দলকে ভোট দেওয়া মানে ভোটটা নষ্ট করা। তাই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আটকে দিতে তারা তৃণমূলকেই ভোট দিয়েছে।

৫. বিজেপির ধর্মীয় মেরুকরণ কাজে দেয়নি: অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচনের মতো পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনেরও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কার্ড খেলেছেন মোদি-শাহ জুটি। তারা যে বাংলায় উন্নয়নের আশ্বাস দেননি তা নয়। তবে ভোটের আগে কৌশলগতভাবে তারা ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পশ্চিমবাংলার চিরকালীন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির মাঠে সেটা খাটেনি। বাংলার সংখ্যালঘু ভোটাররা গত ১০ বছর ধরেই মমতার সঙ্গে ছিলেন, এবার বিজেপির সাম্প্রদায়িক উগ্রতা দেখে তারা মমতার দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকেছেন। তাছাড়া বাংলার উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু ভোটাররা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখে দিতে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। ফলে নির্বাচনী প্রচারণার বিজেপি যে পরিমাণ উত্তপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, ভোটের ভুথে সেটা ততটাই ঠান্ডা হয়ে গেছে এবং এই ধর্মীয় মেরুকরণের সুবিধা বিজেপির চেয়ে তৃণমূলই বেশি পেয়েছে।

এই বিষয়টি উঠে এসেছে মমতাকে শুভেচ্ছা জানানো সর্বভারতীয় নেতাদের কথাতেও।

বাংলায় বিজেপির প্রবল ধাক্কা খাওয়ার আভাস পেয়েই একের পর এক টুইট করে মমতাকে শুভেচ্ছা জানাতে শুরু করেন সর্বভারতীয় নেতারা। চূড়ান্ত ফলপ্রকাশের আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখেন এনসিপি প্রধান শরদ পাওয়ার। এক টুইটে তিনি লিখেন, এই জয়ের জন্য আপনাকে অভিনন্দন। আসুন সবাই মিলে মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করি। করোনা অতিমারীরও মোকাবিলা করি।

মমতাকে শুভেচ্ছা জানান দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এক টুইটে তিনি লিখেন, ল্যান্ডস্লাইড এই জয়ের জন্য মমতা দিদিকে অভিনন্দন। বাংলার মানুষকে ধন্যবাদ।

তৃণমূল নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানান উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। পাশাপাশি মোদিকে কটাক্ষও করেন তিনি। অখিলেশ যাদব টুইট করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঘৃণার রাজনীতিকে পরাজিতকারী বাংলার সজাগ মানুষ ও শ্রীমতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কর্মীদের আন্তরিক অভিনন্দন। এক মহিলাকে ‘দিদি, ও দিদি’ বলে যে অপমান করা হয়েছিল তার যোগ্য জবাব দিয়েছে বাংলার মানুষ।

কংগ্রেস নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শশী থাথুর টুইটে বলেছেন, ‘সাম্প্রদায়িকতা এবং অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের এই অসাধারণ জয়ের জন্য তাকে অভিনন্দন। বাংলা এবং বিশেষ করে নন্দীগ্রামের ভোটাররা বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাদের মনের.যোগাযোগ কার সঙ্গে। বাংলায় হেরে বিজেপি বুঝেছে কাদের সঙ্গে লড়তে এসেছিল’।

প্রাথমিক প্রবণতায় তৃণমূলের জয়ের আভাস পেয়ে মমতাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটের বিরোধী নেতা হার্দিক প্যাটেল। টুইট করে তিনি জানিয়েছেন, ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ একটা দিশা দেখিয়ে দিয়েছে। বাংলার মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে সাম্প্রয়ায়িক রাজনীতিকে হারানো যায়।

নিউজ হান্ট/আরকে

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাতক্ষীরায় স্বস্তির বৃষ্টি
পরবর্তী নিবন্ধরাজশাহীতে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদন কার্যক্রমের উদ্বোধন