যেভাবে ‘হাওর সম্রাট’ হয়ে উঠলেন সাংসদ রতন

30

এক দরিদ্র কৃষকের দ্বিতীয় ছেলে হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মাধ্যমে রাতারাতি হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি। তার অত্যাচার আর অনিয়মের কারনে ‘হাওর সম্রাট’ উপাধীতে ভূষিত করেছেন স্থানীয়রা। বারবার খবরের পাতায় শিরোনাম হয়েছেন ‘হাওরের হাঙ্গর’ নামেও।

এক অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক দশকে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এই সংসদ সদস্যের কর্মকাণ্ড।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ১৯৮৮ সালে ধর্মপাশা’র বাদশাগঞ্জ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেন। ১৯৮৯ সালে পূনরায় পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাস করেন।

কর্মমুখী শিক্ষার জন্য রতন সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৯৩ সালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং (পাওয়ার টেকনোলজি) দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন এবং দীর্ঘ দিন চাকুরী না পেয়ে বেকার জীবন কাটান। পরে ২০০৩ সালে বেসরকারী টেলিফোন সংস্থা-বিআরটিএ-তে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জগন্নাথপুর উপজেলায় যোগদান করেন।

যোগদানের কিছুদিন পর অসদাচরণের দায়ে রতন চাকুরীচ্যুত হন। পরে সিলেট জেলা শ্রমিক লীগের এক নেতার সাথে পরিচয় হয় এবং তার মাধ্যমে পরিচয় হয় সিলেট জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী বিলকিস নূরের সাথে।

বিলকিস নূরকে ব্যবহার করে পরে রতন শাহজালাল বিডি টেলিকম নামে একটি ভিওআইপি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেন। সেখান থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রতনকে বেধে রাখেন বিলকিস নূরের লোকজন। পরে শাহজালাল উপশহর এলাকার তৎকালীন সিটি কাউন্সিলর সৈয়দ মিসবাহ’ ও একজন পুলিশ কর্মকর্তার সহযোগিতায় তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। তখন থেকেই রতন সিলেট ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যান।

এদিকে দুই কোটি টাকার মধ্যে রতন মাত্র ৮০ লাখ টাকা চেক দিয়েছিলেন বিলকিসকে। পরবর্তীতে টাকা পরিশোধ না করায় বিলকিস নূর আদালতে মামলা দায়ের করেন।

সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন থাকাবস্থায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। নিরুপায় হয়ে ঢাকায় ফিরে বেসরকারী টেলিফোন সংস্থা’ বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার রাজউক ভবনের কার্যালয়ে ডানলোপ কোম্পানী’র ডিলারের দোকানে পুনরায় ম্যানেজারের চাকুরী গ্রহণ করেন।

এরপর ওই কোম্পানীর মালিক হঠাৎ মারা যাওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি তার দখলে চলে আসে। টাকার পিছনে আর পড়ে থাকাতে হয় না রতনকে। এই সময় এলাকার বড় ভাই ফারুক আহমদ আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস এর মাধ্যমে সুরঞ্জিত সেনের বাসায় আসা যাওয়া শুরু করেন তিনি।

এদিকে ওয়ান ইলেভেনের সময় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কানাডায় চলে গেলে রতন আবারো ফিরে আসেন গোপনে। এসে সিলেটের সুনামগঞ্জ-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ রফিকুল ইসলাম সোহেল এর বাসায় আশ্রয় নেন। তখন চলছিল উপজেলা নির্বাচনের তোড়জোড়। ঐ সময় তিনি ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।

স্থানীয় রাজনীতিতে কোন্দলের সুযোগে আওয়ামী রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসেন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-১ আসনের দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রয়াত সামাদ আজাদ পন্থী সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল ও প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মধ্যে গ্রুপিং প্রকট আকার ধারণ করে। সেই সুযোগে ২০০৮ সালের নির্বাচনে রতন তার এক বন্ধুর (কানাডা প্রবাসী) রেজাউলের মাধ্যমে নিজের সিভি পাঠিয়ে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতির কাছে।

সেখানেও রতন জালিয়াতির আশ্রয় নেন। ইঞ্জিনিয়ার না হয়েও নিজেকে ইঞ্জিনিয়ার পদবী উল্লেখ করেন। তাছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার মাধ্যমে তৃণমূলের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেন। এরপরই রতনের ভাগ্যে জুটে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা নজির হোসেনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে এমপিও নির্বাচিত হন রতন। এমপি হওয়ার পর থেকেই আর পিছনে ফিরে থাকতে হয়নি তাকে। সম্প্রতি ক্যাসিনো কান্ডে জড়িতদের সম্পদ অনুসন্ধানের শুরুতে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান কার্যক্রম করলেও তালিকা এখন দীর্ঘ হচ্ছে। যাতে বর্তমানে প্রায় ১০০ জনের নাম উঠে এসেছে।

জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান তালিকায় সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের নামও উঠে এসেছে। এলাকায় ও তার বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বারবার খবরের পাতায় শিরোনাম হয়েছেন হাওরের হাঙ্গর নামে। তাকে হাওর সম্রাট হিসেবেও উপাধীতে ভূষিত করেছেন স্থানীয়রা।

সুনামগঞ্জ-১ আসন। এই আসনে রয়েছে মৎস্যভান্ডার ও জলমহাল, পাথর ও বালি কোয়ারী, শুল্ক ষ্টেশন, পাটলাই নদী ও যাদুকাটা নদী’র লোভনীয় অর্থের উৎস। অবৈধভাবে চাঁদাবাজীসহ অসংখ্য অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। দেশের সর্ববৃহৎ মৎস্যভান্ডারসহ হাওরাঞ্চলের বেশিরভাগ জলমহাল, পাথর-বালি কোয়ারি, শুল্ক স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ তারই হাতে। তার ঈশারা ছাড়া কোন দখলই হয় না। এসব থেকে অবৈধভাবে রতন আয় করছেন শত শত কোটি টাকা।

দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় স্থানীয় এক সাংবাদিককে বাড়ী থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে ৪ শতাধিক ইয়াবাট্যাবলেটসহ পুলিশের হাতে তুলে দেন এমপি রতনের পালিত গোন্ডা বাহিনী। সুনামগঞ্জ-১ আসনের তিনটি উপজেলা ও ১টি থানার প্রায় সবকটিতে রয়েছে রতন বাহিনী। স্ব-স্ব এলাকায় তাদের ভয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হয় না। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসবের সত্যতা মিলেছে, হঠাৎ রাজনীতিতে আসা হতদরিদ্র কৃষকের সন্তান সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এবার রাজধানী ঢাকা, সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, নেত্রকোণা ও মোহনগঞ্জে ১৩টি বাড়ির মালিক।

গত নির্বাচনের পূর্বে ধর্মপাশার পাইকুরাটি’র নিজ গ্রামে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘স্বর্ণ মহল’ নামে নির্মাণ করছেন বিলাস বহুল বাড়ি।

এছাড়াও তার রয়েছে দামি ব্রান্ডের ৫টি গাড়ি। কেবল নিজ নামেই নয়, প্রথম স্ত্রী মাহমুদা হোসেন লতাসহ স্বজনদের নামে পাহাড়সম সম্পদ গড়ে তুলেছেন এমপি রতন।

সুনামগঞ্জ শহরের মল্লিকপুরে জেলা পুলিশ লাইন্সের বিপরীতে ৭ কোটি টাকার বাড়ি কিনেন। সেখানে বিশাল আয়তনের প্রাসাদোপম বাড়িটি দেখলে যে কেউ আকৃষ্ট হবে। এছাড়া নিজ গ্রামে তিনি ১০ কোটি টাকায় নির্মাণ করেছেন বিলাস বহুল বাড়ি। ধর্মপাশা উপজেলা সদরে তার আরও ৭টি বাড়ি রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরেও রয়েছে দুটি বাড়ি। নেত্রকোণা জেলা শহরেও ১টি বাড়ি রয়েছে।

ঢাকার আশুলিয়ায় গার্মেন্টস, গুলশানে কয়েকটি ফ্ল্যাট এর মালিক সংসদ সদস্য রতন। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামায় তার স্ত্রী মাহমুদা হোসেন লতা ৪০ তোলা স্বর্ণের মালিক। স্ত্রী’র নামে ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৪ টাকার জমি তিনি দেখিয়েছেন। তবে স্ত্রীর কোনো আয় নেই। নিজের মোট আয় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ টাকা দেখিয়েছেন।

এদিকে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৩২২ টাকা। ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর দেয়া হলফনামার চিত্র পুরো উল্টো। ৫ বছরের ব্যবধানে নিজ নামে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্ত্রী লতার পরিচয় হয় ব্যবসায়ী। হলফনামায় স্ত্রী লতাকে পায়েল টেক্স লিমিটেড এর পরিচালক বানানো হয়। লতার মোট আয় ৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। মোট সম্পদ ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তিনি ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা আয়করও পরিশোধ করেন।

হলফনামায় সংসদ সদস্য রতনের মোট আয় উল্লেখ করা হয়, ২০ লাখ ৩০ হাজার ২৬৪ টাকা, সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৯০৮ টাকা। তিনি ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮২৩ টাকা আয়কর পরিশোধ করেন।

সরকার দলীয় এই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, ক্যাসিনো কাণ্ডে সম্পৃক্ততা, ভূমি দখল, লুটপাট, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচারসহ নানান অভিযোগ উঠেছে। মাত্র এক দশকেই হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এই সংসদ সদস্যের সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। দুদকের ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে অনুসন্ধান কাজ শুরু করেছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) এমপি রতনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইমিগ্রেশন পুলিশে চিঠি দিয়েছে দুদক। চলতি মাসের শুরুতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী সংসদ সদস্য রতনের নানান অনিয়ম- দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে অভিযোগ করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকেও দেয়া হয় অভিযোগের কপি।

অভিযোগ সুত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ-১ আসনের যাদুকাটা নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করা নৌকা থেকে ৫-৮ হাজার টাকা হারে টোল আদায়ের মাধ্যমে দিনে অন্তত ৫০ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে তার নামে। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত রতন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ আদায় করে যাচ্ছেন। এর ভাগ বিভিন্ন দপ্তরেও পৌঁছানো হচ্ছে।

এদিকে ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সুনামগঞ্জ জেলার সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন এ সকল অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে বলেন, দুদক কিছু করলে অবশ্যই আমাকে নোটিশ দিবে। কিন্তু পত্র-পত্রিকায় যা আসছে তা আমার জানা নেই। আমি মিডিয়ায় হয়রানির শিকার হয়ে যাচ্ছি। কিছু করার নাই। এ ধরনের কোনো ঘটনা আমার জানা নেই।

নিউজ হান্ট/এনএইচ