শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ার ডাক শেখ হাসিনার

14

শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে একযোগে কাজ করার জন্য এই অঞ্চলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের শুভ মুহূর্তে আমি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নেতা ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি একটি শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের বসবাস। এ অঞ্চলে সমস্যার পাশাপাশি প্রচুর সম্ভাবনাও রয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষের রয়েছে অসম্ভব প্রাণশক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে জয় করে টিকে থাকার দক্ষতা। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রাণসম্পদকে কাজে লাগিয়ে সহজেই দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এই অঞ্চলের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করলে অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।’

বুধবার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১০ দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজনের অষ্টম দিনের অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং।

বাসসের খবরে বলা হয়, ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত অনুষ্ঠামালার অষ্টম দিন বুধবার থিম ছিল ‘শান্তি, মুক্তি ও মানবতার অগ্রদূত’। বিকেল পৌনে ৫টায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে স্বাগত জানান। এরপর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অষ্টম দিনের অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে।

পরে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ এবং ‘শান্তি, মুক্তি ও মানবতার অগ্রদূত’ থিমের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন শেষে শুরু হয় আলোচনা পর্ব। যেখানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আবদুল মোমেন। থিমভিত্তিক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এমপি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান।

আলোচনা পর্বে সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই লড়াই করেননি। তিনি বিশ্বের সব নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। তিনি শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘এই সরকার জাতির পিতার ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যমআয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সরকার সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘জাতির পিতা এদেশের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এই নীতি নিয়ে তিনি দেশ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সরকার বঙ্গবন্ধুর পথ ধরেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।’

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালাকে ঘিরে ইতোমধ্যে ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের মিলনমেলা বসেছে। আজকের অনুষ্ঠানে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করেছে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে ভুটানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ভুটান বাংলাদেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বন্ধু-রাষ্ট্র। ভৌগোলিক নৈকট্য ছাড়াও দু’দেশের রয়েছে প্রায় একই ধরনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে দু’দেশের অবস্থান প্রায় এক এবং অভিন্ন। দু’দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বহু প্রাচীন।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভুটানের প্রয়াত তৃতীয় রাজা জিগমে দোর্জি ওয়াংচুক ও সেদেশের জনগণ স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের শুধু সমর্থনই দেননি, সাধ্যমত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভুটানের তরুণরা ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আহত ও অসুস্থ বাঙালি শরণার্থীদের সেবা করেছিলেন। ভুটানই প্রথম দেশ, যারা স্বাধীন বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় লাভের আগেই ৬ ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের মানুষ ভুটানের জনগণের সে অবদানের কথা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে ভুটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দোর্জি ওয়াংচুককে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননায় ভূষিত করেছে।’

দু’দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, পর্যটন ও শিক্ষাখাতে সহযোগিতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভুটানি ছাত্র-ছাত্রী বাংলাদেশে চিকিৎসা শাস্ত্রসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। আজকের অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় গ্রাজুয়েশন করেছেন। সে হিসেবে তিনি কেবল ভুটানের নয়, বাংলাদেশেরও মানুষ। আর এটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের। ভুটানের মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগী হতে পেরে বাংলাদেশ গর্বিত।’

অনুষ্ঠানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো এবং ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্গিও ম্যাটেরালার শুভেচ্ছা বার্তা পাঠ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত দেশ দুটির রাষ্ট্রদূতরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্চ মিশেলের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

এছাড়া ভ্যাটিক্যান থেকে পাঠানো পোপ ফ্রান্সিস এবং ভারতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। এরপর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভুটানে প্রকাশিত স্মারক ডাকটিকেট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং। পরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সম্মানিত এই অতিথির হাতে ‘মুজিব চিরন্তন’ শ্রদ্ধা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা পর্বের সমাপ্তি ঘটে।

পরে আধা ঘণ্টার বিরতি দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পর্ব শুরু হয়, যা চলেছে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ছাড়াও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী দর্শকসারিতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

নিউজ হান্ট/আরকে