হেলে-দুলে চলছে দেশের চৌকি আদালতের বিচার কাজ

14

অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক জনগণ, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, দুর্বল নারী ও শিশু এবং অশিক্ষিত ব্যক্তিদের বিনা খরচে আইনি সুবিধা দিতে গঠন করা হয়েছে চৌকি আদালত। শুরুতে বেশ কিছু মামলায় অসহায় বিচারপ্রার্থীরা ন্যায় বিচার পাওয়ায় এই আদালত বেশ সাড়াও ফেলে। কিন্তু অনেক গবির, অসহায় এবং অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের মুখে হাসি ফোটানো সেই আদালতের বিচার কাজই এখন চলছে হেলে-দুলে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে ৪৩টি চৌকি আদালত। সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকার এখতিয়ারের দেওয়ানি মামলাগুলো পরিচালনা করা হয় এই আদালতে।

প্রথমদিকে বিচার কাজ বেশ দ্রুতগতিতে চললেও এখন কোনো কোনো উপজেলার চৌকি আদালতে মামলার জট লেগে আছে। অনেক মামলা ঝুলে আছে কয়েকবছর ধরেই। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার চৌকিতে ঝুলে আছে প্রায় ২৩ হাজার মামলা। পটিয়ার এই চৌকি আদালতে একটি যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, তিনটি সিনিয়র সহকারী জজ ও তিনটি সহকারী জজ সহ একটি জুডিশিয়াল হাকিমের আদালত রয়েছে। এই আটটি আদালতের তিনটিই বিচারক শূন্য।

একই চিত্র অন্যান্য উপজেলাতেও। চট্টগ্রামের ২১টি চৌকির মধ্যে পাঁচটির বিচারক নেই। সাতকানিয়া চৌকির লোহাগাড়া সহকারী জজ আদালতে আড়াই বছর ও সাতকানিয়া অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালতে পাঁচ বছর ধরে বিচারক নেই। ফলে ঝুলে আছে হাজার হাজার মামলা।

একই জেলার রাউজান উপজেলায় চৌকি আদালত রয়েছে একটি। সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের একটি চৌকি আদালতে বর্তমানে কোনো বিচারক নেই। মামলা বিচারাধীন আছে দুই হাজার ৪০০টি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দ্বীপ অঞ্চল সন্দ্বীপে সিনিয়র সহকারী জজ ও জুডিশিয়াল হাকিমের আদালতের এই দুটি আদালতে মামলা বিচারাধীন আছে ৮৫৬টি। বাঁশখালীর চারটি চৌকি আদালতে চার হাজার ৪৬৮টি মামলা বিচারাধীন আছে।

এছাড়াও, বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা চৌকি আদালত ১৯৮৫ সালে চালু হলে ২০০৮ সালে আদালত ভবনটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার। পরে ২০১৪ সালে পাথরঘাটা সরকারি কেএম পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি স্কুলভবন ভাড়া নিয়ে সেখানে আদালতের কার্যক্রম শুরু করে। গত একযুগ ধরে নিজস্ব ভবন না থাকলেও নেয়া হয়নি কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা। ফলে ভাড়া করা স্কুলভবনের কক্ষে ঝুঁকি নিয়ে চলছে বিচারকাজ।

সারা দেশে ফৌজদারি ও দেওয়ানী এই দুই ধরনের ৪৩টি চৌকি আদালত রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি ফৌজদারি আদালত হচ্ছে— দুর্গাপুর, সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, পটিয়া, লামা, মহেশখালী, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, হাতিয়া, জকিগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ, বড়লেখা, ধর্মপাশা, কয়রা, পাইকগাছা, মঠবাড়িয়া, মনপুরা, চরফ্যাসন, মীর্জাগঞ্জ, কলাপাড়া, দশমিনা, গলাচিপা, আমতলী, পাথরঘাটা ও শাহজাদপুর।

এছাড়াও ১৮টি দেওয়ানি চৌকি আদালত রয়েছে। দুর্গাপুর, সন্দ্বীপ, পটিয়া, রাউজান, সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া, চরফ্যাশন, হাতিয়া, শাহজাদপুর, নবীনগর, বাজিতপুর, চিকনদী, কয়রা, পাইকগাছা, ভাঙ্গা, ঈশ্বরগঞ্জ ও গোবিন্দগঞ্জে অবস্থিত।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিরান হোসেন বলেন, ‘চৌকি আদালতের বিচারকের স্বল্পতা আছে, তা পূরণ করার জন্য লোকবল বৃদ্ধি করতে হবে। আদালতে যে অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তার সাথে মনিটরিংও বৃদ্ধি জরুরি। পাশাপাশি আদালতের যে স্টাফ আছে। তদের কার্যক্রমগুলো জোরালোভাবে মনিটরিং করতে হবে যেমন। তেমনি তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে হয়তো চৌকির যেই সমস্যাগুলো আছে তা দ্রুত গতিতে সমাধান হবে এবং জনগণ ন্যায়বিচার পেতে শুরু করবে।’

একই সাথে ভালো মানের আইনজীবীর অভাব। কারণ বেশিরভাগ আইনজীবী মফস্বল এলাকায় থাকতে চায় না। যার ফলে আইনজীবী স্বল্পতাও একটি কারণ। বিচার ব্যবস্থায় গতি আনতে বিচারকের পাশাপাশি আইনজীবীরাও মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান সোহান বলেন, শুধু চৌকি আদালত নয়। বিচার বিভাগের ব্যবহারযোগ্য অধিকাংশ ভবনেরই অবস্থা বেহাল ও নাজুক প্রায়। সেখানে চৌকি আদালতের খেয়াল কে রাখে? চৌকির দিকে কেউ নজরই দেন না। অনেক উপজেলা চৌকি আদালতের ভবনগুলো বর্ষায় পানিতে ডুবে যায় সেই অবস্থায়ই বিচারকাজ চালাতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভবনের জরাজীর্ণতার কারণে অনেক সময় মামলার নথিগুলোও নষ্ট হয়ে যায়। সে জন্য বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে হয়। সংশ্লিষ্টদের উচিত যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিচার বিভাগকে আধুনিকায়ন করা এবং চৌকিগুলোকেও আধুনিক করা। আর প্রত্যেকটি উপজেলায়ই চৌকি আদালত স্থাপন করা উচিত। এতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমবে। সাথে সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলো সেবা পাবে।। তাতে মামলার জটও কমবে বলে আমি মনে করি।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিরাজগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২
পরবর্তী নিবন্ধরাজধানীতে র‌্যাবের হাতে ডাকাত দল গ্রেপ্তার