রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

এগিয়ে যাচ্ছে কর্ণফুলী টানেলের কাজ

আরও পড়ুন

পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার পথে ধাপ ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে সরকারের অন্যতম মেগাপ্রকল্প— কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল।’ দেশে প্রথমবারের মতো কোনো নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন এই টানেল নির্মিত হলে দেশের জিডিপি শূন্য দশমিক ১৬৬ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের দ্বিতীয় সুড়ঙ্গ বা টিউবের খননকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্ণফুলী টানেলের দুটি সুড়ঙ্গের খননই শেষ হলো। এখন বাকি শুধু সুড়ঙ্গের ভেতর রাস্তা তৈরির কাজ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। সেই হিসেবে ২০২৩ সালে টানেল দিয়ে চলবে গাড়ি।

সুড়ঙ্গ খননই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রকল্পের প্রকৌশলীরা বলছেন, এখন যে কাজগুলো রয়েছে সেগুলোকে রুটিন ওয়ার্ক বা সাধারণ কাজ বলা যেতে পারে। সুড়ঙ্গ খনন ছিল চ্যালেঞ্জের কাজ, যা শেষ হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সুড়ঙ্গ খনন বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। এখন রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হবে। মূল চ্যালেঞ্জ আমরা পার করেছি। আশা করি আর জটিলতা নেই। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আমরা কাজ শেষ করে দিব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রকল্পের একটি ইতিবাচক দিক হলো, এর মেয়াদ ও ব্যয় বাড়াতে হয়নি। নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ হচ্ছে। তবে আগেও শেষ হয়ে যেতে পারে। এটি এখন সিউর করে বলছি না।’

সেপ্টেম্বর মাসের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৭৩ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে প্রথম সুড়ঙ্গ খননের কাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষ হয় ২০২০ সালের আগস্টে। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের খনন কাজ উদ্বোধন করা হয়। চট্টগ্রামের আনোয়ারা প্রান্ত থেকে এই খননকাজ শুরু হয়।

সম্প্রতি সেই খননকাজ শেষ হলো। নদীর তলদেশ দিয়ে প্রথম সুড়ঙ্গ খনন করতে ১৭ মাস লেগেছিল, তবে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের ক্ষেত্রে সময় লেগেছে ১০ মাস।

গত বছর খনন শেষ হওয়া প্রথম সুড়ঙ্গে এখন সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। এরই মধ্যে ১ হাজার ৬৪০ মিটার স্ল্যাব ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। আনোয়ারা প্রান্তে উড়ালসেতুর কাজও শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া নগর ও আনোয়ারা প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজও চলছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ প্রকল্পে মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এর মধ্যে টানেলের প্রতিটি সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। টানেলের জন্য কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। ৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতার দুই সুড়ঙ্গে দুটি করে চারটি লেন থাকবে।

মূল টানেলের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে সংযোগ সড়ক থাকবে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া আনোয়ারা প্রান্তে রয়েছে ৭২৭ মিটার দীর্ঘ উড়ালসেতু।

কর্ণফুলী টানেলটি চট্টগ্রাম শহর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামকে যুক্ত করবে। কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অন্য ভাগে রয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম।

টানেল দিয়ে যান চলাচল শুরু হলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসী। নদীর ওপারে আরেকটি শহর গড়ে উঠবে। টানেল হলে চট্টগ্রাম হবে সাংহাইর মতো ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’।

পাশাপাশি টানেল চালু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী যানবাহনকে আর চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করতে হবে না। পতেঙ্গা সিটি আউটার রিং রোড হয়ে টানেলের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে গাড়িগুলো। এতে চট্টগ্রাম শহরে যানবাহনের চাপ কমে যাবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হওয়ার পর টানেলের গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়ার পর চট্টগ্রাম হয়ে যানবাহন এই টানেল দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারবে। এতে দেশের অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘কর্ণফুলী টানেল দেশের অর্থনীতিতে খুবই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রথমত, টানেলের কারণে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড় তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন বেড়ে যাবে।

‘এ ছাড়া দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম প্রসারিত হবে। পাশাপাশি সাগরপাড় ঘেষে আনোয়ারা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত গড়ে উঠবে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহারকারীরাও এটার সুফল ভোগ করবে।’

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার টানেল নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুমোদন পায়। এর আগে টানেলের নির্মাণের জন্য ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও চীনের সরকারি পর্যায়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

চীন সরকার এ টানেল নির্মাণের জন্য দেশটির প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেডকে দায়িত্ব দেয়। নকশা ও অন্যান্য কাজ শেষে ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি টানেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পে ঋণ হিসেবে চাইনিজ এক্সিম ব্যাংক ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার অর্থায়ন করছে। বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকার ব্যয় করবে।

২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে এই টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বছরই আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর এই টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই টানেল নির্মিত হলে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আরও গতি পাবে। এই টানেলের বহুমুখী সুবিধা নেয়ার অপেক্ষায় সবাই। টানেল ঘিরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পেরও বিকাশ ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।

টানেলে যান চলাচল শুরু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামগামী গাড়িগুলোকে আর নগরে প্রবেশ করতে হবে না। চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড হয়ে টানেলের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। এর ফলে চট্টগ্রাম নগরেও যানবাহনের চাপ কমে যাবে। তথ্যসূত্র: নিউজ বাংলা২৪ ডটকম-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন

নিউজ হান্ট/এএস

সর্বশেষ