সোমবার, অক্টোবর ১৮, ২০২১

করোনাকালে চিতলমারীতে ৪০০’র বেশি বাল্যবিয়ে

আরও পড়ুন

চিতলমারী (বাগেরহাট) থেকে বিভাষ দাস: করোনাকালে বাগেরহাট জেলার চিতলমারীতে ৪ শ’য়েরও বেশি বাল্যবিয়ে হয়েছে। তবে বাল্যবিয়ের মাত্রা বাড়লেও উপজেলায় বিদ্যালয় খোলার পরে ছাত্রীরা স্কুলমুখীও হয়েছে ব্যাপকহারে। নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে তারা, এ্যাসাইনমেন্ট জমা দিচ্ছে।

একটি বিদ্যালয়ের বাল্যবিয়ের শিকার ১০ জন ছাত্রীর মধ্যে সাত জন নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে। একাধিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা বাল্যবিয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ ও করণীয় সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেছেন।

বাগেরহাট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামানের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিতলমারী উপজেলায় ৪০৭ শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে।

বাল্যবিয়ের শিকার হয়েও বিদ্যালয়ে আসছে ছাত্রীরা। এমন এক ছাত্রী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলে, “ছেলেরা ডিষ্টার্ব করতো। করোনার কারণে স্কুলও বন্ধ ছিল। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তাই আমার মা বাবা বাধ্য হয়ে বিয়ে দিয়েছেন। লেখাপড়া শিখে আমি বড় হতে চাই। তাই স্কুল খোলার দিন থেকেই নিয়মিত স্কুলে আসছি এবং মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া শুরু করেছি।”

সোমবার (৪ অক্টোবর) কথাগুলো বলে, ১০ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রী।

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার বোয়ালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ওই ছাত্রী বিয়ের পর বিদ্যালয় খোলার শুরু থেকেই বিদ্যালয়ে আসছে। ওই ছাত্রী লেখাপড়ায় মনোযোগ দিয়েছে বলে জানান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৃনাল কান্তি মিস্ত্রি।

প্রধান শিক্ষক মৃনাল কান্তি মিস্ত্রি আরো জানান, করোনায় স্কুল বন্ধকালীন সময়ে তার বিদ্যালয়ের ১০ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে সাত জন এখন নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে। বাকী তিন জনের কোন খোঁজ খবর নেই। ১০ জন ছাত্রীর মধ্যে পাঁচ জন পারিবারিক সিদ্ধান্তের বাইরে পছন্দের ছেলেকে নিজের মতে বিয়ে করেছে। বাকী পাঁচ মেয়েকে পারিবারিকভাবে বিয়ে দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এর থেকে ভালো ছেলে না পাওয়ার আশংকা এবং নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক অভিভাবক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। লেখাপড়া কিংবা কোন কাজে যুক্ত না থাকার ফলেও বাল্যবিয়ের মাত্রা বেড়েছে।

চিতলমারী উপজেলা সদরের চিতলমারী সরকারী এসএম মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমেন্দ্রনাথ মল্লিক জানান, তার বিদ্যালয়ে ১২ জনের বাল্যবিয়ে হয়েছে। উপস্থিতির হার ৭০ ভাগ।

হাসিনা বেগম মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শামীম হোসেন জানান, দীর্ঘদিন পর বিদ্যালয় খোলায় উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছে। প্রায় ৮০ ভাগ উপস্থিতি রয়েছে। বিবাহিত মেয়েরাও আসছে। তাদের বিদ্যালয়ে ২৬ জন মেয়ের বিয়ে হয়েছে।

চিতলমারী দাখিল মাদ্রাসার সুপার এসএম ইদ্রিসুর রহমান জানান, এই মাদ্রাসায় প্রথম থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৪২১ জন এবং ২০২১ সালে শিক্ষার্থী ৪৩৬ জন। তাদের প্রত্যেক শ্রেণিতে সচেতনতামুলক আলোচনা হয়। বাল্যবিয়ের কোন তথ্য নেই। বাল্যবিয়ের মাত্রা বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে তিনি বলেন, করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছেলে মেয়েরা ইন্টারনেট ও মোবাইলে ঝুঁকে পড়ে। এক্ষেত্রে যেসব অভিভাবক উদাসীন তাদের সন্তানেরা বিপথগামী হয়েছে। অভিভাবক এবং যারা বিয়ে পড়ায় তাদের সচেতনতা বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।

চিতলমারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান জানান, মিডিয়াকে দেয়ার মতো বাল্যবিয়ের কোন তথ্য আমার কাছে নেই।

চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলী জানান, করোনাকালে বাল্যবিয়ের ব্যাপারে লিখিত কোন তথ্য কোন দপ্তর হতে তিনি পাননি। বাল্যবিয়ে আয়োজনের কোন খবর পেলে তা প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত রয়েছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যেক ক্লাশে বাল্যবিয়ের কুফল ও আইন সম্পর্কে আলোচনা করতে বলা হয়েছে।

নিউজ হান্ট/এএস

সর্বশেষ