বুধবার, ডিসেম্বর ১, ২০২১

যেভাবে নিউজ হান্টের জন্ম

আরও পড়ুন

অমৃত মলঙ্গী: মহামারীর কঠিন সময়ে সাধারণ তরুণেরা যখন কাজ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায়, তখন মৌসুমী সুলতানা আপার নেতৃত্বে আমি এবং আমরা কয়েক জন প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে নিউজ হান্টের যাত্রা শুরু করি, ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। মাত্র এক বছরের মধ্যে আমরা কোটি মানুষের হৃদয় যেমন জয় করেছি,তেমনি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বেশি আশাবাদী হয়েছি।

করোনার সেই কঠিন সময়ে ঘরবন্দি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে সময় কাটিয়েছে তা দেখে আমার মনে হয়েছিল ডিজিটাল মিডিয়ায় এখনই অপার সম্ভাবনা। ওদিকে প্রিন্ট পত্রিকা তখন মানুষ পড়ছে না। আমরা এই সুযোগটাই নিয়েছি।

আমার তখন মনে হচ্ছিল কিছু একটা করতে হবে। এরপর এক বন্ধুকে বললাম, আমাকে একটা ওয়েবসাইট করে দাও। সে অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিষয়ে অনেক দক্ষ। কয়েক দিনের মধ্যে ওয়েবসাইট প্রস্তুত হল। আমি এবার বিনিয়োগকারীর সন্ধানে নামলাম। যাতে পোর্টালটা ভালোভাবে চালাতে পারি।

কয়েক জন সিনিয়রের সঙ্গে আলাপ করলাম। একজন জানালেন, চ্যানেল আইয়ের মৌসুমী আপুও একটা মিডিয়ার কথা ভাবছেন। তার সঙ্গে যেন আমি যোগাযোগ করি।

আমিও যেহেতু এক সময় চ্যানেল আইয়ে ছিলাম, তাই আমার কাজ সম্পর্কে আগে থেকেই আপার একটা ধারণা ছিল। আপাকে আইডিয়া দিলাম। উনি পছন্দ করলেন।

মৌসুমী আপা চ্যানেল আইয়ে ১৩ বছর কাজ করেছেন। তাই ওনাকেই সম্পাদক হওয়ার প্রস্তাব দেই।

তখন আমরা কয়েক জন মিলে খুব ছোট পরিসরে কাজে নামি। আগের ওয়েবসাইটে কাজ হলো না। অনেক আলোচনা করে ‘নিউজ হান্ট’ নাম চূড়ান্ত করে নতুন ওয়েবসাইট বানাতে হল। এরপর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা লোগো নির্বাচন করি।

অমৃত মলঙ্গী, চিফ নিউজ এডিটর

আমাদের টার্গেট ছিল মূলত ২০২১ সালের শুরুতে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করব। পরে আর অপেক্ষা করতে চাইনি। সেপ্টেম্বরের এক সোমবার গভীর রাতে প্রথম নিউজ প্রকাশ করা হয়।

শুরুতে দুটি নামি পত্রিকার কয়েক জন বন্ধুকে পার্টটাইম কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেই। তারা নিজেদের অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় বসে আমাকে অনুবাদ ভিত্তিক নিউজ দিত।

এভাবে কয়েক মাস চলার পর মৌসুমী আপাকে বললাম, নতুন কিছু করতে হবে। তখন আমার মাথায় লাইভের বিষয়টি এল। বাংলাদেশের অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে ভালো উপস্থাপক সাধারণত দেখা যায় না। আমি কাউকে অসম্মান করছি না। আসল বিষয়টা হলো, অনলাইনে টিভি থেকে খুব কম প্রতিবেদক কাজ করতে আসেন। অনলাইন, প্রিন্টের কর্মীরা একটু আলাদা ধাঁচের। তারা লেখালেখিতে দক্ষ হলেও উপস্থাপনায় ওই মানের নন।

কিছু প্রতিষ্ঠানে অবশ্য ব্যতিক্রম উদাহরণ আছে। কয়েকটি পোর্টালকে আমরা দেখেছি ভালো ভয়েসের উপস্থাপক দিয়ে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করতে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে এটা কেউ ধরে রাখেনি।

আমি আমাদের কর্মীদের বললাম, ‘এই জায়গাটা আমরা দখল করতে চাই। টিভিতে মানুষ খবর দেখে ঠিক আছে। অনলাইন পোর্টালগুলো এখনো ওইভাবে ভিডিও কনটেন্ট শুরু করেনি। লাইভ তো না-ই। আমরা এমন একটা জায়গায় যেতে চাই, যেখানে পোর্টালের পাঠকেরা আমাদের খুঁজবেন।’

তখন সারা দেশে লকডাউন। আমি আর মৌসুমী আপা রাস্তায় রাস্তায় লাইভ করি। আমি রেডিওতে কাজ করেছি আগে। তাই রেডিও জকির কাজ এবং টিভি সাংবাদিকের কাজের একটা সমন্বয় করি। টিভি সাংবাদিকেরা লাইভের সময় শুধু তথ্যই দিয়ে যান। আবার আরজেরা কথা যেমন বলেন, তেমনি দর্শক, শ্রোতাদের সঙ্গে একটা সম্পর্কও তৈরি করেন। কমেন্ট পড়েন। আমি লাইভের ভেতর এই কাজটিই করতে থাকি।

মনে আছে একদিন আসাদ গেটে দাঁড়িয়ে লাইভ করছিলাম। সেদিন দেখি কমেন্টের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে আমার লাইভে। লাইভের ভেতর সেদিন প্রথম এক হাজার কমেন্ট আসে! রেডিও জকির ক্যারিয়ারেও এমন অভিজ্ঞতা হয়নি আমার। সেদিন টানা এক ঘণ্টা লাইভ করে অফিসে আসি।

ওই লাইভের অভিজ্ঞতা মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেয়। মৌসুমী আপা বললেন, ‘আমাদের পলিসি এখন থেকে এটাই। আমরা পাঠক, দর্শকদের ঘটনার আরও কাছে নিয়ে যেতে চাই। সরাসরি সম্প্রচারে তাদের কথা শুনতে চাই। তারা কী জানতে চান, সেটি আমরা লাইভে শুনব।’

এরপর মৌসুমী আপা এভাবে লাইভ শুরু করতেই রীতিমতো ইতিহাস গড়ে ফেলি আমরা। মাসে ৫ কোটি দর্শকের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলি।

মৌসুমী আপা এখন সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় এক নাম। আমরা ঢাকার বাইরে কাজে গেলেও দেখি মানুষ আপাকে চেনেন।ঢাকার রাস্তায় লাইভ করতে গেলে মানুষ কাছে এসে বলেন, ‘নিউজ হান্ট প্রতিদিন দেখি।’ এমন অভিজ্ঞতা আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।

দেশের অধিকাংশ নামি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে আমাদের লাইভ নিয়ে এখন আলোচনা হয়। গত সপ্তাহে কোর্টে লাইভ শেষে দাঁড়াতেই অন্য একটি পত্রিকার প্রতিবেদক এসে বলছিলেন, ‘আপনাদের দেখে এখন অন্য অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো মাল্টি মিডিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবছে। আমরা আপনাদের নিয়ে আলোচনা করি।’

এর অন্য চিত্রও আছে। শুরুতে অনেকেই আমাদের গুরুত্ব দিতে চাননি। কিন্তু আমার এবং মৌসুমী আপার উপস্থাপনার দক্ষতা দেখে তারা গুরুত্ব দিতে বাধ্য হতেন। ধীরে ধীরে সবাই আমাদের কাজের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে পারেন। পরিস্থিতি তখন পাল্টাতে শুরু করে।

মনে আছে শুরুর দিনগুলোতে মানুষ আমাদের দেখত না। ২০, ৩০ কখনো ৪০০-৫০০ ভিউ হতো। আমি বুঝলাম, কোথাও একটা সমস্যা হচ্ছে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেসবুক কর্মীর সাহায্য নেই। আমার এক বন্ধু ওনাকে চিনতেন। উনি আমাকে কিছু টিপস দেন। আর ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর পড়াশোনা করতে বলেন। এরপর ধীরে ধীরে নিউজ হান্টের ফেসবুক পেজের অবস্থা পাল্টে যেতে শুরু করে।

নিউজ হান্ট তুমুল আলোচনায় আসে ই-অরেঞ্জের ঘটনার সময়। প্রতারিত গ্রাহকদের আন্দোলনের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা কাভারেজ দেই। সেদিন রাতে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার বাড়ির সামনে আমার ওপর হামলা হয়। নাক ফেটে যায়। রক্ত পড়তে থাকে। চশমা গুড়িয়ে যায়। চশমা ছাড়া কাছে দেখলেও দূরে দেখতে পাই না। চোখে পানি আসে। তবু ওই অবস্থায় মাশরাফীকে নিয়ে আমি এক্সক্লুসিভ লাইভ সাক্ষাৎকার করি। আমাদের ওই লাইভের পর থানা মামলা নেয়। কয়েক ঘণ্টার  মধ্যে ২০ লাখ মানুষ ভিডিওটি দেখেন।’

আমাদের খবরে অনেকের জীবনও বদলে গেছে। মোহাম্মদপুরের বিহারি ক্যাম্পের মাহাবুব নামের একটি পথশিশুকে নিয়ে ‘বড় ছেলে মাহাবুব’ শিরোনামে আমরা সংবাদ প্রকাশ করি। মৌসুমী আপা ছেলেটাকে খুঁজে বের করেন। অনেক মানুষ পরে তাকে সাহায্য করেছেন। আমরা নিজেরাও করেছি। মাহাবুব এখন নিয়মিত স্কুলে যায়।

লালমাটিয়ায় মেহমানখানা নামের একটি সংগঠন আছে। তারা প্রতিদিন মানুষকে বিনা মূল্যে খাবার দেয়। ‘মেহমানখানার ইতিহাস বলতে বলতে কাঁদলেন লিজা’ এই শিরোনামে ভিডিও সংবাদ প্রকাশের পর শত শত মানুষ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংগঠনটিকে সাহায্য করেছেন। এই লাইভটিও মৌসুমী আপার। লাইভেই মূলত আমাদের ফোকাস বেশি। আমি শুরু থেকে সহকর্মীদের বলেছি, `দর্শকদের সঙ্গে প্রতারণা করতে চাই না, তাই সরাসরি ঘটনার কাছে নিয়ে যাব।‘

চ্যালেঞ্জটা এখানেই। সরাসরি দেখাতে গেলে এর ভেতরই সম্পাদনার কাজ করতে হবে। কতটুকু দেখাব, কোথায় থামব সেটি মাথায় রাখতে হয়।

আমি দেখেছি নিউজ হান্টের খবর মানুষ বিশ্বাস করেন। আমাদের লাইভে হাজার-হাজার ইতিবাচক কমেন্ট আসে। গণমানুষের এই আস্থার প্রতিদান প্রতিদিন আমরা দিয়ে যেতে চাই।

সর্বশেষ