সোমবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২১

প্রেমের টানে বাংলাদেশে আসা ফিলিপাইনি নারী এখন ইউপি মেম্বার

আরও পড়ুন

প্রেমের টানে বাংলাদেশে এসেছিলেন ফিলিপাইনি নারী জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা। এখন তিনি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ১১ নম্বর রাধাকানাই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিজয়ী ইউপি মেম্বার (সদস্য)।

দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন—জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা ওরফে জেসমিন আক্তার জুলহাস নামের এই নারী। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ১১ নম্বর রাধাকানাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ১, ২, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী আসনে সদস্য পদে মাইক প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি।

জানা গেছে, জীন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা ছিলেন ফিলিপাইনের নাগরিক। পড়াশোনা করেছেন সেখানকার নামি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ বিভাগে। গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্নের পর সিঙ্গাপুরে চাকরি করতে গিয়ে পরিচয় হয় বাংলাদেশি তরুণ জুলহাস উদ্দিনের সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম, এরপর বিয়ে।

গেল ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ইউপি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। ভোট গণনা শেষে জেসমিন আক্তার ৪ হাজার ৪৯৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোছা. শিমু আক্তার বক প্রতীক নিয়ে ভোট পান ১ হাজার ৮৩৭টি।

এখন গ্রামে বের হলেই শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও জেসমিন আক্তারকে দেখার জন্য আসছেন। তার মুখে ইংরেজি কথা শুনে অনেকেই আনন্দ পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে কিছু কিছু বাংলা শব্দও বলতে শিখে গেছেন জেসমিন আক্তার। এ ছাড়া তার স্বামী জুলহাস মিয়া দোভাষী হিসেবে সাধারণ মানুষের কথা ইংরেজিতে অনুবাদ করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন জেসমিন আক্তারকে।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার ১১ নম্বর রাধাকানাই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দবরদস্তা গ্রামের আবদুস সামাদ মণ্ডলের ছেলে জুলহাস মিয়া ১৯৯৮ সালের শেষের দিকে একটি কোম্পানিতে চাকরি করতে সিঙ্গাপুর পাড়ি জমান। সেখানে কিছুদিন চাকরি করার পর একই কোম্পানিতে চাকরিরত ফিলিপাইনের নাগরিক জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকার সঙ্গে পরিচয় হয়। দীর্ঘদিনের প্রবাসজীবনে তাঁদের মধ্যে সেই পরিচয় ভালোবাসায় গড়ায়। একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা তার নিজ দেশ ফিলিপাইনে চলে যান। অন্যদিকে, জুলহাস মিয়াও বাংলাদেশে চলে আসেন। তবে তারা প্রেমের সম্পর্ক ঠিক রাখতে মুঠোফোনে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যান।

পরে জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা জুলহাস মিয়াকে বিয়ে করবেন— এমন শর্তে ফিলিপাইনে আসতে বলেন প্রেমিক জুলহাসকে। জুলহাস মিয়া প্রেমের টানে ফিলিপাইনে গিয়ে জিনের পারিবারিক সম্মতিক্রমে বিয়ের সব আয়োজন ঠিক করেন। বিয়ের পূর্বমুহূর্তে সংশ্লিষ্ট বিয়ের আয়োজকেরা বলেন, দুজন দুই ধর্মের, সংসারজীবনে অশান্তি তৈরি হতে পারে। তাই দুজনের যেকোনো একজনকে তার ধর্ম ছেড়ে আসতে হবে।

পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন জিন ক্যাটামিন পেট্রিয়াকা। বিয়ের পর তার নতুন নাম রাখা হয় জেসমিন আক্তার জুলহাস। বাংলাদেশে ফিরে আসার পর এ দেশের নাগরিকত্ব পান তিনি। ২০১০ সালের দিকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। বিয়ের পর থেকে ধর্মীয় সব ধরনের নিয়মকানুন মেনে দিন যাপন করছেন জেসমিন। বাংলাদেশে প্রায় ১১ বছর হয়ে গেছে তার সংসারের বয়স। জাহিদুল ইসলাম ও ফারিয়া আক্তার নামের দুই ছেলেমেয়ে রয়েছে এ দম্পতির।

নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটারদের কাছে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন— এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেসমিন আক্তার জুলহাস গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার স্বামী জুলহাসকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসি। তার জন্যই নিজের দেশ ও মা–বাবাকে ছেড়ে বাংলাদেশ ছুটে আসা। সে আমাকে এ দেশের সবুজ প্রকৃতি ও মানুষকে চিনিয়েছে। আমি ধন্যবাদ জানাই সরকারকে। কোনোরূপ জটিলতা ছাড়াই এ দেশের সরকার আমাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়েছে। এ দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়।’

“তবে নারীদের ভেতর শিক্ষার অভাব রয়েছে। অনেক শিশু স্কুলে যায় না। রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষকেরা তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই সমস্যাগুলো সমাধানে আমি সব সময় ভাবতাম কী করা যায়। কিন্তু কখনো নির্বাচনে দাঁড়াব বলে কল্পনাও করিনি।”

তিনি বলেন, ‘আমার এলাকার মানুষ, গ্রামের মানুষ আমাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়। তাদের উপকারে আমাকে পাশে দেখতে চায়। গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে দিতে চায়। মূলত, গ্রামের মানুষের অনুরোধে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। ভোট দিয়ে যেসব মানুষ আমাকে জয়যুক্ত করেছে, আমি যেন সারা জীবন তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকতে পারি।’

জুলহাস উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আমার মনের পাশাপাশি আমার স্ত্রী এলাকাবাসীর মনও জয় করতে পেরেছে। তাদের জন্যই নির্বাচন করেছে এবং তারাই জয়লাভ করিয়েছে। আমার আশা সবার সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে থেকে সাধারণ মানুষের উপকার করে যাবে পেট্রিয়াকা।

পেট্রিয়াকা জয় পাওয়ার পর বাড়িতে এসে অনেকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি করেছেন আনন্দ মিছিলও।

প্রতিবেশীরা বলেন, তিনি নিজের দেশ, পরিবার ছেড়ে এখানে এসে আমাদেরকে আপন করে নিয়েছেন। আমরাও তাকে অনেক পছন্দ করি। সেজন্যই তাকে আমরা ভোট দিয়ে পাস করিয়েছি। তিনি এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন।

নিউজ হান্ট/এএস

সর্বশেষ