রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

ফরাসি ধর্মযাজকদের যৌন নির্যাতনের শিকার ২১৬,০০০ শিশু

আরও পড়ুন

ফ্রান্সে ১৯৫০-এর দশক থেকে রোমান ক্যাথলিক চার্চে ঘটে যাওয়া বহু যৌন নির্যাতনের ঘটনার তদন্তের জন্য গঠিত এক নিরপেক্ষ কমিশনের প্রধান বলেছেন, ফরাসি ক্যাথলিক চার্চে যৌন নিপীড়নের তদন্তে দেখা গেছে যে, ১৯৫০ সাল থেকে আনুমানিক ২১৬,০০০ শিশু যাজকদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। আর চার্চের সাধারণ সদস্যদের দ্বারা যৌননির্যাতিতদের ধরলে এই সংখ্যা ৩৩০,০০০ হাজার হতে পারে।

আজ মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) প্রতিবেদনটির সংকলনকারী কমিশনের প্রধান জঁ-মার্ক সোভ এ তথ্য জানিয়েছেন।

গত ২০ বছরে সারা বিশ্বে যৌন নির্যাতন কেলেঙ্কারির সিরিজের মধ্যে ফ্রান্সের রোমান ক্যাথলিক গির্জরা প্রকাশ্য কাহিনী সর্বশেষতম ঘটনা।

এর আগে জঁ-মার্ক সোভ ফরাসি বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছিলেন, ২,৯০০ থেকে ৩,২০০ শিশু নির্যাতনকারী পাদ্রী এবং অন্যান্য যাজকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন তারা।

তিনি তখন আরও বলেছিলেন, ‘এটি হচ্ছে ন্যূনতম অনুমান।’

মোট ১১৫,০০০ জন পাদ্রী ও অন্য গির্জা কর্মকর্তার ব্যাপারে তদন্ত চালানো হয়। রিপোর্টটি তৈরি হয়েছে চার্চ, আদালত এবং পুলিশের দলিলপত্রের আর্কাইভে পাওয়া তথ্য এবং যৌন নির্যাতনের শিকারদের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে।

আজ এই তদন্তের চুড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছে। রিপোর্টটি মোট আড়াই হাজার পৃষ্ঠার।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, জঁ-মার্ক সোভ তাদের রিপোর্টে বলেছেন, অপব্যবহার পদ্ধতিগত ছিল। চার্চ ‘ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবর্তে নিজেকে রক্ষা করে’ বছরের পর বছর ধরে গভীর, সম্পূর্ণ এবং এমনকি নিষ্ঠুর উদাসীনতা দেখিয়েছিল।

তিনি বলেন, গির্জা অপব্যবহার রোধে কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তো গ্রহণ করেইনি, উল্টো তারা চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। অপব্যবহারের প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কখনো কখনো জেনে-বুঝে শিশুদের শিকারীদের সংস্পর্শে রেখেছে।

সোভের রিপোর্ট উপস্থাপনের ঠিক পরেই রিমসের আর্চবিশপ এবং বিশপদের ফরাসি সম্মেলনের প্রধান এরিক ডি মৌলিন্স-বিউফোর্ট এটাকে তাদের জন্য লজ্জাজনক
উল্লেখ করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং এ নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিভিন্ন দেশে কয়েকটি কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর ফরাসি ক্যাথলিক গির্জা কর্তৃপক্ষ ২০১৮ সালে ঐ তদন্তের আদেশ দেয়। এটি চার্চ থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করেছে।

সোভ বলেন, সমস্যাটা এখনও আছে। তিনি আরও বলেন, ২০০০ সাল পর্যন্ত চার্চগুলো ভুক্তভোগীদের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীনতা দেখিয়েছিল এবং ২০১৫-২০১৬ সালের দিকে তাদের মনোভাব কিছুটা পরিবর্তন করতে শুরু করে।

ক্যাথলিক চার্চের যৌনতা, আনুগত্য এবং পুরোহিতের পবিত্রতার মতো বিষয়গুলোর শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি আড়ালে থাকে, যা ধর্মযাজকদের দ্বারা যৌন নির্যাতন ঘটতে দিতে সাহায্য করেছিল। সোভ বলেন, গির্জার প্রতি সমাজের বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের জন্য এই বিষয়গুলোতে সংস্কার করা দরকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন সাক্ষ্য আহ্বানের মাধ্যমে প্রায় ২৭০০ ভুক্তভোগীকে চিহ্নিত করেছে এবং আরও হাজার হাজার তথ্য আর্কাইভে পাওয়া গেছে।
কিন্তু গবেষণা এবং পোলিং গ্রুপের একটি বিস্তৃত গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, প্রায় ২১৬,০০০ ভুক্তভোগী ছিল এবং সাধারণ সদস্যদের দ্বারা যৌননির্যাতনসহ এই সংখ্যা ৩৩০,০০০ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

ভিকটিমস অ্যাসোসিয়েশন লা প্যারোল লিবারি প্রতিষ্ঠা করা ফ্রাঙ্কোয়া ডেভাক্স প্রতিবেদনটি উপস্থাপনার আগে গির্জার প্রতিনিধিদের বলেন, ‘আপনারা আমাদের মানবতার জন্য লজ্জা’।

ডেভাক্স চার্চগুলোর বিরুদ্ধে কাপুরুষতার অভিযোগ করে বলেন, ‘এই নরকে জঘন্য গণঅপরাধ হয়েছে..তবে আরও খারাপ হয়েছে, বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, মনোবলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং শিশুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’

কমিশনের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ডাক্তার, ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং ধর্মতত্ত্ববিদরা। আড়াই বছরের মধ্যে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি সাক্ষীর সাথে যোগাযোগ করা হয়।

রোমান ক্যাথলিক প্রকাশনা দ্য ট্যাবলেটের ক্রিস্টোফার ল্যাম্ব বলেছেন, এই যৌন নির্যাতন কেলেঙ্কারি ক্যাথলিক চার্চকে গত ৫০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে ফেলে দিয়েছিল।

নিউজ হান্ট/আরকে

সর্বশেষ