বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২১, ২০২১

বিদ্যুৎখাতের উন্নয়নে বিদ্যুৎ গতি (পর্ব-২)

আরও পড়ুন

বিশেষ প্রতিবেদন:

বিশ্বের অনেক দেশকেই পেছনে ফেলে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন করে ইতোমধ্যে সারাবিশ্বের নজরে এসেছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশও লাভ করেছে বাংলাদেশ। এসব সাফল্যের পেছনে অবদান রয়েছে বিদ্যুৎ খাতের।

স্বাধীনতার আগের বিদ্যুৎ খাত ১৯০১ সালের ৭ ডিসেম্বর তারিখে আহসান মঞ্জিলে জেনারেটরের সহায়তায় বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে এই অঞ্চলে বিদ্যুতের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩০ সালে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রথম বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা চালু হয় এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে বিতরণ করার লক্ষ্যে ‘ধানমন্ডি পাওয়ার হাউজ’ স্থাপন করা হয়।

ভারত উপমহাদেশ স্বাধীনতাকালে ১৯৪৭ সালে এই অঞ্চলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের ব্যবস্থা চালু ছিল। তারপর ১৭টি প্রাদেশিক জেলার কেবল শহরাঞ্চলে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অধিকাংশ জেলায় কেবল রাতে সীমিত সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। ঢাকায় ১ হাজার ৫০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো।

১৯৪৮ সালে বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ অধিদফতর স্থাপন করা হয়। ১৯৫৯ সালে পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ওয়াপদা) স্থাপন করার মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের নবদিগন্তের সূচনা হয় এবং এ খাত একটি কাঠামো লাভ করে। ১৯৬০ সালে বিদ্যুৎ অধিদফতরটি ওয়াপদার সঙ্গে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মাত্রা লাভ করে। সেসময়ে সিদ্ধিরগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনায় অপেক্ষাকৃত বড় আকারের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সিদ্ধিরগঞ্জে স্থাপন করা হয় ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার স্টিম টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

একই সময়ে, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে কাপ্তাইয়ে ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র ইউনিট স্থাপন করা হয়, যা সেই সময়ে বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ছিল। ১৯৬২ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম ১৩২ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন চালু করা হয় যা এই দেশের বিদ্যুৎ বিকাশের মাইলফলক।

স্বাধীনতার পর বিদ্যুতের সোনালি যাত্রাস্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষি বিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলে বৈদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়। যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার রূপকল্প নতুন রূপ পায়।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিক-নির্দেশনামূলক ভাষণে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ছাড়া কোনো কাজ হয় না, কিন্তু দেশের জনসংখ্যা শতকরা ১৫ ভাগ লোক যে শহরের অধিবাসী সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা থাকিলেও শতকরা ৮৫ জনের বাসস্থান গ্রামে বিদ্যুৎ নাই। গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করিতে হইবে। ইহার ফলে গ্রাম বাংলার সর্বক্ষেত্রে উন্নতি হইবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ চালু করিতে পারিলে কয়েক বছরের মধ্যে আর বিদেশ হইতে খাদ্য আমদানি করিতে হইবে না।’

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার ৫৯ (PO-৫৯) এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের ৩১ মে ওয়াপদাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গঠন করেন। এর ফলে সমগ্র দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের দায়িত্ব অর্পিত হয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর।

১৯৭২-৭৫ এই সময়ে আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল ও সিদ্ধিরগঞ্জে তিনটি পাওয়ার হাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের অপরিসীম গুরুত্বের বিষয় বিবেচনা করে ১৯৭৭ সালের অক্টোবরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) সৃষ্টি করা হয়।

বিদ্যুৎ খাতে সাফল্য ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বিদ্যুৎ খাত সংস্কার কর্মসূচির আওতায় বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত সংস্কার করে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে নানা সংস্থা ও কোম্পানি গঠন করা হয়। বিদ্যুৎ খাতের মতো জ্বালানি খাতেও কাঠামোগত সংস্কার করে নানাবিধ সংস্থা ও কোম্পানি গঠন করা হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ১ হাজার ৬০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়। ১৯৯৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ‘প্রাইভেট সেক্টর পাওয়ার জেনারেশন পলিসি অব বাংলাদেশ’ প্রণয়ন করা হয়।

যার ফলে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ প্রায় ৫০ ভাগ। তাছাড়া বিদ্যুতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। পরে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন দিন বদলের সনদ ২০২১ ‘রূপকল্প’। তিনি নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দেন ২০২১ সালের মধ্যে সবার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো হবে।

নিউজ হান্ট/ম

সর্বশেষ