সোমবার, নভেম্বর ২৯, ২০২১

হারাতে বসেছে বাঁশঝাড়

আরও পড়ুন

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) থেকে মোহাম্মদ আমিনুল হক বুলবুল: “বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই /মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?” —কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা ‘কাজলা দিদি’ কবিতার এই লাইনগুলো আমাদের সবার কাছেই কম বেশি পরিচিত। পুরো কবিতা মুখস্ত না থাকলেও অন্তত এই লাইন দু’টি জানেন না এমন মানুষ এদেশে প্রায় নেই বললেই চলে। কবিতাটিতে ‘বাঁশ বাগান’ নিয়ে যে গ্রামীণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তাও আমাদের অনেকেরেই চেনা।

গ্রামীণ জনপদ মানেই ঝোঁপঝাঁড়, জঙ্গল আর বাঁশঝাড়ে ঢেউ খেলানো সবুজ প্রকৃতি। বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার চিরায়ত রূপ।

একটা সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশঝাড় ছিল। বিভিন্ন পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকতো এসব বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়কে বাড়ির পর্দা মনে করা হতো। যেখানে গ্রাম সেখানে বাঁশঝাড় এমনটিই ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু বর্তমানে নির্বিচারে বাঁশ কাটা ও পরিচর্যার অভাবে বাঁশঝাড় ক্রমশই কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির দুর্যোগ প্রতিরোধক ও পরিবেশের পরমবন্ধু সেই বাঁশঝাড়। কালের বিবর্তনে ও নগরায়ণের ফলে বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় হারাতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্পও।

প্রকৃতিতে বাঁশঝাড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং জীববৈচিত্র ধ্বংস হওয়া রোধে সহায়ক এই বাঁশঝাড় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। নির্বিচারে বাঁশ কাটার ফলে উজাড় হচ্ছে একের পর এক বাঁশের ঝাড়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এই বাঁশঝাড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাঁশ গাছ অন্য যেকোন গাছের তুলনায় দ্রুত গতিতে ক্ষতিকর কার্বন গ্যাস শুষে নিতে সক্ষম এবং এর শিকড় মাটি ক্ষয়ে যাওয়া রোধ করতে পারে। তাই বাঁশঝাড় টিকিয়ে রাখার তাগিদ দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও প্রকৃতি প্রেমিরা।

আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বাঁশের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাঁশ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা। সম্মিলিত প্রচেষ্টার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের ব্যবহার। একসময় চারপাশে পর্যাপ্ত বাঁশের ঝাড় দেখা গেলেও বর্তমানে ময়মনসিংহের নান্দাইলে তা বিলুপ্তির পথে।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নিকট বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। ধানের গোলা তৈরি, বেড়া বা গৃহ নির্মাণ, মঞ্চ নির্মাণ, মই, জোয়াল, ঝুড়ি, ঝাকা, চালুন, খাঁচা, পাটি, খাড়ি, ঝাড়ু, কুলা, হাতপাখা, মাদুর, বাঁশের দোচালা ও চারচালা ঘর, ঘরের খুঁটি, ঘরের ঝাপ, বেলকি, কার, ঘরের মাচা, ঘরের খাট, ঘরের আসবাব হিসেবে মোড়া, চাঁটাই, সোফা, বুকসেলফ, ছাইদানি, ফুলদানি, প্রসাধনী বাক্স, ছবির ফ্রেম, আয়নার ফ্রেম, সিগারেট রাখার ছাইদানি, নুনদানি, পানদানি, চুনদানি, ইত্যাদিসহ নিত্যদিনের ব্যবহার্য বিবিধ জিনিসপত্র তৈরির কাজে বাঁশের রয়েছে বহুল ব্যবহার। গ্রামের প্রতিটি কৃষক তার ফসলের ক্ষেতে বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে ফসল রক্ষা করতো। আদিকাল থেকেই বাঁশের ব্যপক ব্যবহার চলে আসছে।

বাঁশ দিয়ে বিভিন্নরকম পণ্য যেমন, প্লাইবোর্ড, পার্টিকেল বোর্ডসহ গৃহস্থালির আসবাবপত্র তৈরি করা হচ্ছে। বাঁশ দিয়ে রকমারি আসবাবপত্র যেমন সোফা, চেয়ার, টেবিল, খাট, ওয়ারড্রব তৈরি করে কাঠের চাহিদা পূরণ করা হয়। বাঁশের তৈরি এসব আসবাবপত্র ও শৌখিন গৃহসামগ্রী বিদেশেও রফতানি করেও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হচ্ছে। তাছাড়া মুলি বাঁশ দিয়ে গ্রামীণ জনপদে বাড়িঘর নির্মাণ, বাড়ির বেড়া, সিলিং তৈরি ও বাঁশের বেত দিয়ে চাটাই তৈরি করে ঘরের পার্টিশন দেয়া হয়। বাজালি বাঁশ দিয়ে বাঁশি তৈরি হয়। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাঁশের বাঁশির কদর যুগ যুগ ধরেই শিল্পী সমাজে সমাদৃত হয়ে আসছে। শক্ত প্রকৃতির বরাগ বাঁশ দিয়ে বাড়িঘরের খুঁটি, সাঁকো নির্মাণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা হয়।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ময়মনসিংহের নান্দাইলের গ্রামীণ জনপদেও এক সময় তৈরি হতো হাজারো বাঁশের পণ্য সামগ্রী। ঘরের কাছের ঝাড় থেকে তরতাজা বাঁশ কেটে গৃহীনিরা তৈরি করতেন হরেক রকম জিনিস। অনেকে এ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বাঁশঝাড় নির্বিচারে কেটে ফেলার কারণে বর্তমানে প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য আর গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্য কুটির শিল্প আজ হারিয়ে যাচ্ছে। আগের মত পর্যাপ্ত বাঁশ না থাকায় দিনদিন বেকার হয়ে পড়ছে কুটিরশিল্পের সাথে জড়িত পরিবারগুলো। বাঁশের দরদাম অধিক হওয়ায় তারা কুটিরশিল্প সামগ্রী বানাতে বিপাকে পড়ছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নান্দাইলের প্রতিটি জনপদে আগের মতো আর বাঁশঝাড় নেই। কারণে-অকারণে কাটা হচ্ছে বাঁশ। পানের বরজ, শশা, সীম, করলা, লাউ, ঝিঙে ক্ষেতে মাচা দিতে কাটা হচ্ছে বাঁশ। পাইকারদের কাছে করা হচ্ছে বিক্রি। বীরকামট খালী গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের একটি বাঁশঝাড় কেটে ফেলা হচ্ছে। কেন বাঁশঝাড় কাটছেন, জানতে চাইলে বাঁশের ব্যাপারী আজিম উদ্দিন জানান, তিনি আট হাজার টাকা দিয়ে বাঁশঝাড় কিনেছেন। বাঁশঝাড়ের মালিক মোসলেম উদ্দিন বলেন, বিদ্যুতের লাইন বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার কারণে বিক্রি করে দিয়েছি।

লক্ষিপুর গ্রামের মুর্শিদ বলেন, বাপদাদার আমল থেকে আমাদের বাঁশঝাড় থাকলেও নতুন বাড়ি তৈরি করার কারণে একটি বাঁশঝাড় কেটে ফেলেছি, অন্যগুলোও পরিচর্যা ও দেখভালের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

বীরকামট খালী গ্রামের কামাল উদ্দিন নতুন ঘর নির্মাণ ও বাঁশের ভালো দাম পাওয়ায় বাঁশঝাড় বিক্রির কথা জানান।

অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক শিক্ষাবিদ আলী আফজাল খান বলেন, গ্রামীণ জীবনে বাঁশের প্রয়োজন সর্বত্র। মানুষের মৃত্যুর পরে কবরে যেমন বাঁশের প্রয়োজন, ঠিক বেঁচে থাকা অবস্থায় গৃহস্থালির প্রতিটি কাজে বাঁশের প্রয়োজন আছে। বাঁশের তৈরি হস্তশিল্প দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি পরিবেশ বান্ধব। তাই নির্বিচারে বাঁশ না কেটে বেশী করে বাঁশ লাগানো এবং বাঁশঝাড় সংরক্ষনের উপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, শীতল ছাঁয়া ও পরিবেশের ভারসম্য রক্ষায় বাঁশের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাঁশঝাড় না কেটে বেশী করে বাঁশ লাগানোর উপর জোর দেন তিনি।

নিউজ হান্ট/এএস

সর্বশেষ